এ কে এম আব্দুল্লাহ, নেত্রকোণাঃ
নেত্রকোণা জেলা শহরের মগড়া নদী উদ্ধারের নামে নদী তীরবর্তী বৈধ জমির মালিকদের নানা ধরনের হয়রানি ও স্থাপনা উচ্ছেদের চেষ্টা এবং নদী খনন ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে সরকারি অর্থ লুটপাটে পাঁয়তারা’র প্রতিবাদে নেত্রকোণায় সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ রবিবার (৮ নভেম্বর) বেলা ১১টায় জেলা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে নেত্রকোণা পৌর এলাকার নদী তীরবর্তী ভুক্তভোগী পরিবার বৃন্দ এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন, মিজানুর রহমান ইমন। এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন, মোঃ আলাউদ্দিন, জামাল উদ্দিন খান, আজহারুল ইসলাম আবু, গাজী আব্দুর রহিম রুহী প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, একটি প্রভাবশালী চক্র পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কতিপয় কর্মকর্তার সহযোগিতায় সরকারি বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা লুটপাটের পাঁয়তারা করছে। একই সঙ্গে নদী তীরবর্তী এলাকায় বৈধ মালিকানাধীন জমিতে বসবাসকারীদের সিএস নকশার দোহাই দিয়ে উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০২৫ সালের মে মাসে পাউবো’র কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নদী উদ্ধারের নামে নেত্রকোণা পৌরসভার মগড়া নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের বসতভিটা ও দোকানপাটে প্রবেশ করে সিএস নকশা অনুযায়ী জমি পরিমাপের চেষ্টা করেন। এ সময় কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এর প্রতিবাদে ভুক্তভোগীরা ২০২৫ সালের ২২ মে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর গণস্বাক্ষরসহ আবেদন করেন। পরে তারা জানতে পারেন, মগড়া নদী সংক্রান্ত একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) মগড়া নদীর আদি প্রবাহ অনুযায়ী সিএস, আরএস মূলে নদীর সীমানা নির্ধারণসহ দখল ও দূষনমুক্ত করার বিষয়ে প্রতিকার চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন।
এ ছাড়া ২০০৯ সালের ৩৫০৩ নম্বর রিটের রায়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ভূমির মালিকেরা বলেন, নদীর সীমানা নির্ধারণে সিএস ও আরএস নকশার পাশাপাশি আইনানুগভাবে দেওয়া সরকারি বন্দোবস্তও বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তাদের দাবি, বিআরএস খতিয়ান অনুযায়ী বৈধভাবে কেনা ও ভোগদখলে থাকা জমি কেবল সিএস নকশার ভিত্তিতে উচ্ছেদের উদ্যোগ আইনসম্মত নয়।
তারা আরও বলেন, নদী তীরবর্তী অনেক জমি বিআরএস রেকর্ডে ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে রয়েছে। এসব জমি সরকারি নিয়ম মেনে কেনাবেচা ও হস্তান্তর হয়েছে। মালিকেরা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে বসবাস করছেন। এ অবস্থায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তাদের উচ্ছেদের উদ্যোগ নাগরিকের সম্পত্তির অধিকারের পরিপন্থী।
সংবাদ সম্মেলনে মগড়া নদী খনন ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মগড়া নদীর মাত্র ৪১ কিলোমিটার খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উজান ও ভাটির ১১৪ কিলোমিটার অংশ খনন না করে মাঝের অংশ খনন করা হলে পরবর্তী সময়ে সেখানে আবার পলি জমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হতে পারে।
পাউবোর পরিকল্পনা অনুযায়ী, নদীটি ১ দশমিক ৫ থেকে ২ মিটার গভীর করে খনন করা হলে নেত্রকোণা শহরের সাতপাই, মোক্তারপাড়া, কাটলী ও আরামবাগ এলাকার জনবসতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে সাতপাই থেকে তেরী বাজার পর্যন্ত নদীর তীরে ব্লক বসিয়ে শহর রক্ষার কাজ করা হয়েছিল। এ অবস্থায় নদী আরও গভীর করে খননের আগে শহরের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ও নদীতীরের স্থিতিশীলতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সমীক্ষা করা প্রয়োজন।
ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও আপত্তি জানিয়ে তারা বলেন, নেত্রকোণা পৌর এলাকায় মগড়া নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় সাত কিলোমিটার। দুই তীর মিলিয়ে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪ কিলোমিটার হলেও প্রকল্পে একেক তীরে মাত্র ৮০০ মিটার করে ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এত সীমিত দৈর্ঘ্যের ওয়াকওয়ের যৌক্তিকতা ও ব্যয় পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে নদীতীরবর্তী জমির মালিকদের উচ্ছেদ ও হয়রানি বন্ধ, নদীর সীমানা নির্ধারণে সিএস, আরএস ও বিআরএসসহ সংশ্লিষ্ট সব ভূমি রেকর্ড এবং আইনানুগ বন্দোবস্ত বিবেচনায় নিয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ জরিপ পরিচালনার দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া হাইকোর্টের রিট পিটিশন ৫১৬১/২০২৫ -এর রুল ও আদেশের সত্যায়িত অনুলিপি প্রকাশ, নদী খনন প্রকল্পের ডিপিপি, অনুমোদিত ব্যয়, দরপত্র, নকশা ও কারিগরি তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানান তাঁরা।
প্রকল্পের কারিগরি ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন এবং খননের ফলে নেত্রকোণা শহরের বিভিন্ন জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়বে কি না, তা নিরূপণেরও দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, প্রকল্পের পরিকল্পনা, ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র ও বাস্তবায়নে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভুক্তভোগী ভূমির মালিকেরা বলেন, নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার উদ্যোগের বিরোধিতা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে নদী উদ্ধারের নামে বৈধ জমির মালিকদের নানা ধরনের হয়রানি, বেআইনি উচ্ছেদ কিংবা ওয়াকওয়ে নির্মাণের নামে সরকারি অর্থের লুটপাটের পায়তারা কোন ভাবেই মেনে নেয়া হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা সরকার প্রধান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জোর দাবী জানান।