বুধবার ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গৌরীপুর রাজবাড়ির জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর জীবনকাহিনী ও কীর্তি

 |  আপডেট ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৩ মে ২০২৬ | প্রিন্ট  

গৌরীপুর রাজবাড়ির জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর জীবনকাহিনী ও কীর্তি

 

মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার, সাংবাদিক, গবেষক ও ইতিহাস সন্ধানী


গৌরীপুর এস্টেট জমিদার বাড়ি বা রাজবাড়ি ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলায় অবস্থিত। ১৭৭০ সালে  এই জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৭০ হতে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মোট ১০ জন জমিদারি পরিচালনা করে আসছিলেন। তন্মধ্যে কোর্ট অব ওয়ার্ডস ব্যতীত নারী জমিদার তিন জন ও পুরুষ জমিদার ছয় জন। এই ছয় জন পুরুষ জমিদারদের মধ্যে তিন জন দত্তক ছিলেন। বাংলা ২৯ বৈশাখ, ১৪৩৩ ও ইংরেজি ১২ মে, ২০২৬ খ্রি. প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, লেখক, সমাজসেবক ও দানবীর  গৌরীপুর রাজবাড়ির ৫ম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর ১৫৩তম জন্মদিন। তার ১৫৩তম জন্মদিন  উদযাপন উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী স্মরণসভার আয়োজনসহ ইতিবৃত্ত গবেষণা ও বিভিন্ন অনুসন্ধানী কাজ সম্পন্ন করতে যাচ্ছে ময়মনসিংহের গৌরীপুরস্থ এসিক এসোসিয়েশন,  ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরি, ক্রিয়েটিভ সন্ধানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্লাব এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স এর যৌথ উদ্যোগে। বাংলার ইতিহাসের স্মরণীয় এক নাম জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। ৭৭টি ঐতিহাসিক নিদর্শন,পুরাকীর্তি, স্থাপত্য,  প্রাচীন মানচিত্র, প্রাচীন বই, ইত্যাদির অনেক বিষয় লুকিয়ে আছে গৌরীপুরের ইতিহাসে । লুকিয়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতাকে  আমাদের জনসম্মুখে হাজির করেছে ময়মনসিহের গৌরীপুরে অবস্থিত  গবেষণা কেন্দ্র ও ইতিহাস অনুসন্ধানী সংগঠনগুলো । শুধুমাত্র এই একটি কারণে সংগঠনগুলো আমাদের কাছে অমর হয়ে থাকবে ।  ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর ১৫৩তম জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে তার আপডেট  ইতিহাস ও  ঐতিহ্যের শেকড় সন্ধানী তথ্য ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই উপলক্ষে গৌরীপুর রাজবাড়িতে দু’টি ডিসপ্লে বোর্ড টানানো হয়েছে।  ব্রজেন্দ্রকিশোর অনেক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ক্রীড়াজগতের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। স্বভাবত তিনি ছিলেন মেধাবী, উচ্চমনা ও প্রতিভাশালী। তিনি সঙ্গীত শাস্ত্রে বিশেষ অনুুরাগী ছিলেন। তিনি একজন নাট্যশিল্পী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দানের প্রস্তাব করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। প্রখ্যাত যন্ত্রসঙ্গীতশিল্পী বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী তাঁর পুত্র। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোমেনসিং, জাফরশাহী, শেলবর্ষসহ ৪টি পরগানার জায়গীরদার, গৌরীপুরের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদারদের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃঞ্চ চৌধুরী বংশের ষষ্ঠ পুরুষ ও গৌরীপুর রাজবাড়ির ৪র্থ পুরুষ জমিদার রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ১৮৭৩ খ্রি.( বাংলা ১২৮০ সালে) ২৪ বছর বয়সে নবীন যৌবনে মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে পুরুষ জমিদারী পরিচালনা বা পতির জলপিন্ড সংস্থানের জন্য প্রয়াত রাজেন্দ্র কিশোরের সহধর্মিণী বিশ্বেশ্বরী দেবী চৌধুরাণী ১৮৭৭ খ্রি.( বাংলা ১২৮৪ সালে) রাজশাহী বিভাগের বালিহার গ্রাম নিবাসী হরিপ্রসাদ ভট্টাচার্যের ২য় পুত্র ব্রজেন্দ্র কিশোরকে দত্তক পুত্ররূপে গ্রহণ করেন। যিনি ১২৮১ বঙ্গাব্দের  ২৯ বৈশাখ ( ইংরেজি ১২ মে, ১৮৭৪ সালে )  রাজশাহী বিভাগের নওগা জেলার  বালিহার গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।  ইতিহাস বলছে, গৌরীপুর রাজবাড়ির রাজেন্দ্র কিশোরের অসুস্থ শরীর ও উদাসীনতা সময়ে বিশ্বেশ্বরী দেবী  স্বহস্তে জমিদারির তত্ত্বাবধান ভার গ্রহণ করেন। বিশ্বেশ্বরী দেবী ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ সদর চিকিৎসালয়ের সাহায্যকল্পে পনের হাজার টাকা দান করেন। ময়মনসিংহ সরকারী (জাতীয়) স্কুলের প্রতিষ্ঠার জন্য এককালীন টাকা ও পতির নামে একটি মাসিক বৃত্তি প্রদান করে দানশীলতা পরিচয় দিয়েছেন। কিশোরগঞ্জ জাতীয় স্কুলও মাসিক সাহায্য প্রদান করতে  ছিলেন। তাছাড়া তার প্রবর্তিত নিয়ম অনুসারে প্রতি বছর অষ্টমী উপলক্ষে বিভিন্ন পরগনা অঞ্চলের বহু সংখ্যক যাত্রী গৌরীপুরে তিন দিন ব্যাপী খাবারের ব্যবস্থা করা হতো। গৌরীপুর রাজবাড়ির ৫ম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী একজন প্রকৃতি প্রেমিক ও জ্ঞানান্বেষী ছিলেন। বাংলার ছয় ঋতুর মধ্যে প্রতিটি ঋতুর রয়েছে আলাদা আলাদা সৌন্দর্য । তাই  ঋতু নামের সাথে মিল রেখে তার দুই মেয়ের নাম রাখা হয়েছিল হেমন্তবালা ও বসন্তবালা। তার  আমলেই নির্মিত হয়েছিল বোটানিক্যাল গার্ডেন, দু’টি বিখ্যাত বাংলো ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । সে সময়ের ইতিহাসের তথ্যগুলোকে গবেষকদের শ্রম ও নিষ্ঠা দিয়ে চয়ন করা হয়েছে ৷ গৌরীপুর ও অন্যান্য স্থানের অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল  ইতিহাসকে  নিজস্ব সত্য ও তথ্যের আলোকে আলোকিত করা হয়েছে। জরিপ ও যুগ যুগ ধরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের আপডেট তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য গবেষনার মাধ্যমে জনসম্মুখে হাজির করা হয়েছে । যেমনঃ যেমনঃ

গৌরীপুর শহরে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন স্থাপন:

ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী গৌরীপুরের মধ্য শহরে অবস্থিত রাজপ্রাসাদ প্রাঙ্গনের চারদিকে দেড়শ বিঘা (৪৯.৫ একর) জমির উপর একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন স্থাপন করেন। বোটানিক্যাল গার্ডেনের মধ্যে ছিল পামবীথি সড়ক, অনন্ত সাগর, গোলপুকুর, জোড়া পুকুর, বৃত্তাকার দ্বীপ, রানীর দীঘি,  প্রাচীন দুর্গামন্দির, নাট্যমন্দির (বর্তমান ঝলমল সিনেমা হল), গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, জলসা ঘর, রেস্ট হাউজ, গেস্ট হাউজ বা অতিথিশালা (১ম, ২য়, ৩য় শ্রেণি), কাচারি ভবন, রাজপ্রাসাদ, যুগলকিশোর আমলের বৃক্ষরোপণের দেবদারু গাছসহ অনেক মূল্যবান ও দূর্লভ গাছগাছালি। এ ছাড়াও ছিল বটগাছ ও বিভিন্ন মূল্যবান ঔষধি গাছ।

১৯৪৭ সালের পর থেকে বোটানিক্যাল গার্ডেনটি বিভিন্ন খন্ডে বিভক্ত হতে থাকে। ইতিহাস বলছে, পাটবাজার মোড় হতে মধ্যবাাজার মোড় পর্যন্ত বাজার পশ্চিম লাইন, গৌরীপুর মহিলা অনার্স কলেজ, গৌরীপুর উপজেলা পরিষদ, গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মুক্তমঞ্চ, জোড়া পুকুর চত্বর, শহীদ হারুন পার্ক, বড় মসজিদ, কালীখলা প্রাঙ্গন, পৌর ভূমি অফিস, কৃষি অফিস, জলসা ঘর, রেস্ট হাউজ, সিনেমা হল রোড, গোবিন্দবাড়ি মন্দির, রাজবাড়ি রোড ও রাজবাড়িসহ অনেক স্থাপত্য গার্ডেনের আওতায় ছিল।

উত্তরবাজারে ছিল শতবর্ষী রেইনট্রি গাছের সারি যা একটি বড় নদীবন্দরের  দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতো। কোনাপাড়া বা দূর হতে রেইনট্রি গাছের সারির দিকে তাকালে অনেকটা পাহাড়ের মতো দেখাতো । ধানমহাল নিবাসী  অরুন ঘোষের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, পাকিস্তান আমলে উপজেলার মূল ফটকটি যেখানে আছে, সেখানে  ছিল না, উপজেলা বাউন্ডারি উত্তরের দেওয়াল ও পাশে রাস্তাটিও ছিল না।  বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মোড় হতে সিনেমা হল মোড় পর্যন্ত একটা মোটা দেওয়ালের বাউন্ডারি ছিল। তখন মূল ফটক ছিল জোড়া পুকুর চত্বরে। কাছারি ভবন অর্থাৎ বর্তমান প্রেস ক্লাবের সামনে ফুলের বাগান ছিল। এই বাউন্ডারির মধ্যে ছিল অনেক মূল্যবান ও দূর্লভ গাছগাছালি, তাছাড়া বিভিন্ন মূল্যবান ওষুধি গাছ এবং ফল ও ফুলের গাছ। তিনি আরো বলেন, আশির দশক পর্যন্ত উপজেলা পরিষদের বাউন্ডারির ভিতর অংশটি ‘বাগান’ নামে পরিচিত ছিল।

গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা:

গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (সংক্ষেপে গৌরীপুর আর. কে. সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়। এর রয়েছে একশত বছরেরও অধিক সময়ের স্মরণীয় ও সুদীর্ঘ ইতিহাস। গৌরীপুর রাজপ্রাসাদ প্রাঙ্গনে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন স্থাপনের পর এখানে উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন গৌরীপুর রাজবাড়ির পঞ্চম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। তিনি ১০ জুলাই ১৯১১ খ্রিঃ তাঁর পিতা প্রয়াত রাজেন্দ্র কিশোর চৌধুরীর নামানুসারে ১১ একর জমিতে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার সময় বিদ্যালয়ের নাম ছিল ‘দি রাজেন্দ্র কিশোর হাই স্কুল’ (রাজেন্দ্র কিশোর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়)  । বিদ্যালয়টি ২৫ এপ্রিল, ১৯৯১ খ্রিঃ সরকারিকরণ হয়। তখন থেকে এই বিদ্যালয়ের নামের সাথে সরকারি যুক্ত করা হয়। উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিশাল জায়গা জুড়ে, সুন্দর মনোমুগ্ধকর ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশে গড়ে  ওঠেছে প্রাচীনতম, মানসন্মত ও ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠ। স্কুল ক্যাম্পাসে সাড়ে তিন একর জমিতে তখন সাগরের মতো বিশাল একটি দীঘি খনন করা হয়, তাই তার স্ত্রী অনন্তবালা দেবী নামের সাথে যোগ করে এর নাম হয় অনন্ত সাগর।

এখানেই শেষ নয়, জমিদার আমলে নির্মিত ইংরেজি বর্ণমালা ‘ই’ আকৃতির আদলে  ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবমণ্ডিত  বিদ্যাপীঠের অপূর্ব কারুকাজ ও নির্মাণশৈলী দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। বিদ্যালয়ের সামনে ও দীঘির পশ্চিমপাড়ে একটি  ছোট মাঠ রয়েছে এবং  বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে ‘আর. কে. স্কুল খেলার মাঠ’ নামে একটি বিশাল মাঠ। বিদ্যালয়ে আধুনিক স্থাপনা বলতে রয়েছে – একটি দুইতলা, একটি তিনতলা, ছয়তলা ভবন , একটি মসজিদ, একটি মিনি পার্ক, একটি ছাত্রাবাস এবং শিক্ষক কর্মচারীদের লজ বা থাকার নিজেস্ব জায়গা।

গবেষণায় ও ইতিহাসে জানা গেছে  গৌরীপুর রাজবাড়ির ইতিহাসে তৃতীয়তম নারী জমিদার বিশ্বেশ্বরী দেবী চৌধুরানী এক অত্যন্ত প্রভাবশালী, বিদুষী এবং জনহিতৈষী ব্যক্তিত্ব, যিনি জমিদার রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর পত্নী ছিলেন। তবে, তিনি কেবল জমিদার-পত্নী হিসেবেই নন, বরং একজন দৃঢ়চেতা নারী হিসেবেও ইতিহাসে স্মরণীয়। তার স্বামী রাজেন্দ্র কিশোর পরলোক প্রাপ্তির পর জমিদারির পরিচালনা ভার গ্রহণ করেন। স্বামীর স্মৃতি, স্বপ্ন আর সাহস বুকে ধারণ করে এবং মানসিক ধাক্কায় দ্রুত বদলে গিয়েছিল বিশ্বেশ্বরী দেবীর জীবন। একাকিত্ব ভাবনা থেকে সরে আসার জন্য নিজেকে জমিদারির কাজে মানিয়ে নিতে পারলে সামনের পথচলা হবে সাফল্যময়। বিশ্বেশ্বরী দেবী দত্তক পুত্র নেওয়ার জন্য অনেক জমিদার বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করার পর তার স্বামীর মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে দত্তক পুত্রের জন্ম হয়। ১৮৭৭ সালে রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার বালিহার গ্রাম নিবাসী জমিদার হরিপ্রসাদ ভট্টাচার্যের ২য় পুত্র রজনীপ্রসাদকে দত্তক গ্রহণ করেন। বিশ্বেশ্বরী দেবীর এই দত্তক পুত্র রজনীপ্রসাদই বাংলার সুপ্রসিদ্ধ দানবীর স্বনামধন্য ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। তখন বিশ্বেশ্বরী দেবী তার জীবনে মা ও বাবার ভূমিকা পালন করেছিলেন। মা-পুত্রের মধ্যে সম্পত্তি ও ক্ষমতা ভাগ হওয়ার সময়ে সমস্ত সম্পত্তি এক চতুর্থাংশ বিশ্বেশ্বরী দেবীর হাতে রইল ও অপর তিন চতুর্থাংশ ব্রজেন্দ্র কিশোর সম্পত্তির অধিকারী হলেন। তিনি তীর্থস্থানে যাওয়ার আগে তাঁর সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ তাঁর ছেলে ব্রজেন্দ্র কিশোরের কাছে হস্তান্তর করেন এবং উক্ত সম্পদের অর্জিত ও সঞ্চিত অর্থ দিয়ে তাঁর স্বামীর নামে দেশের সবচেয়ে সুন্দর একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার জন্য বলে যান। মা’র আদেশ পালন করে ৫ম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পিতা রাজেন্দ্র কিশোর নামানুসারে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। রামগোপালপুরের জমিদার শ্রী শৌরীন্দ্র্র কিশোর রায় চৌধুরীর ১৯১১ সালে প্রকাশিত ‘ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার’ গ্রন্থে বিশ্বেশ্বরীর তীর্থবাসের কথা উল্লেখ রয়েছে। তার কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া হলো: “বিশ্বেশ্বরী দেবী এখনও জীবিতা আছেন। ধর্ম চিন্তাই এক্ষণে তাহার একমাত্র অবলম্বনীয় হইয়াছে। জীবনে গৃহাশ্রমের কোন সুখই তাহার ভাগ্যে ঘটে নাই, গৃহ-বাসে তাহার আসক্তিও নাই। তীর্থস্থান ও গঙ্গাতীরই তাহার প্রকৃত বাসস্থান হইয়াছে। বর্তমান সময়ে তিনি বৈদ্যনাথ দেওঘরে অবস্থান করিতেছেন।“ ছাত্রদের মধ্যে চিরদিন বেঁচে থাকবেন প্রাণপ্রিয় এ বিদুষী নারী । বিশ্বেশ্বরী দেবীর জীবদ্দশায় নিজের নামে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাইতেন না।  গবেষণায় ও ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায়, ব্রজেন্দ্র কিশোরের পরবর্তী দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্বেশ্বরী দেবীর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

ঈশ্বরগঞ্জে বিশ্বেশ্বরী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা:

গৌরীপুরের তৎকালীন জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কাঁচামাটিয়া কোলে ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা শহরে ঈশ্বরগঞ্জ বিশ্বেশ্বরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে বিদ্যালয়টি মোমেনসিং, জাফরশাহী , সিন্দাবাজু ও শেলবর্ষ পরগানার জায়গীরদার, গৌরীপুরের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদারদের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী বংশের পঞ্চম পুরুষ ও গৌরীপুর রাজবাড়ির তৃতীয় পুরুষ জমিদার আনন্দ কিশোর রায় চৌধুরী (ঈশ্বর চন্দ্র চৌধুরী) এর পুত্রবধু , চতুর্থ পুরুষ জমিদার রাজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর সহধর্মিণী ও পঞ্চম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর মা বিশ্বেশ্বরী দেবীর নামানুসারে বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় ‘বিশ্বেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়’।

মোমেনসিং পরগণার মধ্যে ঈশ্বরগঞ্জের গোড়াপত্তন  ও নামকরণ করা হয়। উল্লেখ যে, বিশ্বেশ্বরী দেবীর শশুর আনন্দ কিশোরের আগের নামেই ঈশ্বরগঞ্জ নামক বাজারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। গৌরীপুর রাজবাড়ির তৃতীয় নারী জমিদার বিশ্বেশ্বরী দেবীর সহযোগিতায় ১৮৮০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ঈশ্বরগঞ্জ থানার কাছে একটি চৌকি (মুনসেফী) আদালত স্থাপন করে। তখন ব্রজেন্দ্র কিশোরের বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। সাব-রেজিস্টার অফিস স্থাপিত হয় বিশ্বেশ্বরী দেবীর আমলে। তখন ঈশ্বরগঞ্জ বাজারকে চৌকি ঈশ্বরগঞ্জ বলা হতো। বিশ্বেশ্বরী দেবী এমন একজন ত্যাগী ও ধৈর্যশীল নারী ছিলেন তার নাম কালীপুরের ছোটতরফের জমিদার ধরনীকান্ত লাহিড়ীর ‘ভারত ভ্রমণ’ বইয়ের ভূমিকার পাতার উল্লেখ রয়েছে। বিশ্বেশ্বরী দেবীর মৃত্যুর তথ্য ১৯১৭ সালে প্রকাশিত F.A. Sachse এর Bengal District Gazetteers’ Mymensingh ১৫৭ পৃষ্ঠায় লেখা আছে Jugal Kishor’s share descended through an adopted grandson to Rajendra Kishor, who again died childless. His widow Bisveswari Debi enjoyed a fourth of the estate (Gauripur 4 annas) as a separate estate until her death a short time ago. Her adopted son, Brajendra Kishor, who brought the wellknown swadeshi case against Mr. Clarke, the Collector of the district, in connection with the Jamalpur riots in 1907, is the sole proprietor of the second 4 annas share. সুতরাং বিশ্বেশ্বরী দেবীর মৃ্ত্যু হয়েছিল ১৯১৬ বা ১৯১৫ সালের দিকে।  বিশ্বেশ্বরী দেবীর মৃত্যুর পর ঈশ্বরগঞ্জে মায়ের কৃতিত্ব স্মরনীয় করে রাখার জন্য ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়’ (বর্তমানে ঈশ্বরগঞ্জ বিশ্বেশ্বরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়)। প্রতিষ্ঠাতা-জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক বাবু কালী কিশোর গুহ রায়-সহ সাত জন শিক্ষক, একজন অফিস সহকারী, একজন দপ্তরী ও একজন নৈশপ্রহরী নিয়ে বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়।

মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়  কলেজ এর প্রতিষ্ঠাতা :

ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনামলে তৎকালীন ময়মনসিংহের গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাই  বিশ্বেশ্বরী দেবীর মৃত্যুর পর শিক্ষা ক্ষেত্রে মায়ের কৃতিত্ব স্মরনীয় করে রাখার জন্য ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ১ জানুয়ারি ১৯২০ খ্রিঃ তাঁর মাতা বিশ্বেশ্বরী রায় চৌধুরাণীর নামানুসারে মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী মাইনর স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকালে তিনি প্রতিষ্ঠানের স্থান ও খেলার মাঠসহ ৫.৬০ একর জমিসহ নগদ অর্থ প্রদান করেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে নাম ছিল মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী এম ই (মাইনর এডুকেশন) স্কুল। সে সময়ে তৃতীয় শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু ছিল।

তবে গৌরীপুর উপজেলার নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না যে, সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর বাজারে তৎকালীন গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধূরীর এক গৌরবময় ইতিহাস ধারণ করে আছে আজকের মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজটি।

Facebook Comments Box
ব্যাকগ্রাউন্ড
বর্ডার
শিরোনাম
ফন্ট: 55px

১৩ মে, ২০২৬
গৌরীপুর রাজবাড়ির জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর জীবনকাহিনী ও কীর্তি
বিস্তারিত কমেন্টে

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

এই মাত্র পাওয়া

মো: আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার চেয়ারম্যান:
মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম,বিএ (অনার্স)এম এ বাংলা প্রকাশক ও সম্পাদক:
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

স্টেশন বাজার, কাপাসিয়া রোড,পূর্বধলা নেত্রকোনা।

হেল্প লাইনঃ 01711176181

E-mail: amdadul398@gmail.com

120