শুক্রবার ২৪শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

গৌরীপুরের কালীপুর ছোট তরফ জমিদারবাড়ির শতবর্ষী নাগলিঙ্গম গাছ: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

 |  আপডেট ৯:১৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট  

গৌরীপুরের কালীপুর ছোট তরফ জমিদারবাড়ির শতবর্ষী নাগলিঙ্গম গাছ: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী
মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার,
সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক, গবেষক ও ইতিহাস সন্ধানী

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ঐতিহাসিক কালীপুর ছোট তরফ জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে, বর্তমান গৌরীপুর থানার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক বিরল ও প্রাচীন নাগলিঙ্গম গাছ। সময়ের অসংখ্য পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী এই বৃক্ষ কেবল একটি উদ্ভিদ নয়; এটি কালীপুর রাজপরিবারের ঐতিহ্য, প্রকৃতিপ্রেম এবং স্থানীয় ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক। ভারত ও বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম গাছ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি পবিত্র হিসেবে বিবেচিত এবং বহু শিবমন্দিরের প্রাঙ্গণে এ গাছ দেখা যায়।


ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অ্যান্ড লাইব্রেরি এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাফেয়ার্সের যৌথ উদ্যোগে ২০২০ সাল থেকে মোমেনসিংহ পরগনা, জামালপুরের জাফরশাহী পরগনা এবং বগুড়ার শেলবর্ষ পরগণার প্রাচীন নিদর্শন অনুসন্ধানে একটি জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে গৌরীপুরের কালীপুর এলাকায় মাঠ জরিপের সময় স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে ছোট তরফ জমিদারি এবং এই নাগলিঙ্গম গাছের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হয়।

নাগলিঙ্গমের বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis। এর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। স্থানীয় জনশ্রুতি ও গবেষণার ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, বহু আগে কালীপুর ছোট তরফ জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে গাছটি রোপণ করা হয়েছিল। যদিও এর সুনির্দিষ্ট রোপণকাল বা বয়সসংক্রান্ত কোনো প্রামাণ্য দলিল এখনো পাওয়া যায়নি, গবেষক ও স্থানীয়দের ধারণা অনুযায়ী এটি দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো হতে পারে।

গাছটির রোপণকাল সম্পর্কে একাধিক মত রয়েছে। একটি মতে, নারী জমিদার গঙ্গাদেবীর শাসনামলে এটি রোপণ করা হয়। অন্যদিকে ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত বিচার করলে ধারণা করা যায়, এটি কালীপুর ছোট তরফের জমিদার তারিণীকান্ত লাহিড়ি চৌধুরী (১৮০৭–১৮৮৪) অথবা তাঁর দত্তকপুত্র ধরণীকান্ত লাহিড়ি চৌধুরীর (মৃত্যু: ১৯১৮) আমলেও রোপিত হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা ও প্রামাণ্য দলিল অনুসন্ধানের প্রয়োজন থাকতে পারে।

নাগলিঙ্গম গাছটির একশত গজ দূরে অবস্থিত দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো হরগঙ্গেশ্বর নামে দুটি প্রাচীন শিবমন্দির এর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশাল কাণ্ড, বিস্তৃত শাখা-প্রশাখা, কাণ্ডজুড়ে ফোটা সুগন্ধি ফুল এবং বড় গোলাকার ফল গাছটিকে অনন্য বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, একসময় কালীপুর রাজবাড়ির বাগানবাড়ির হাতিশালার হাতিদের এই গাছের ফল খাওয়ানো হতো। নাগলিঙ্গমের ফল আকারে বড় ও গোলাকার হওয়ায় এটি কামানের গোলার মতো দেখতে। এ কারণেই ইংরেজিতে গাছটিকে Cannonball Tree বা ‘কামানের গোলা গাছ’ বলা হয়। তবে এ ফল মানুষের খাদ্য হিসেবে উপযোগী নয় এবং ফলের ভেতর থেকে তীব্র গন্ধ বের হয়।

নাগলিঙ্গম ফুলের গঠন বিশ্বের অন্যতম ব্যতিক্রমী ফুলগুলোর মধ্যে একটি। ফুলের কেন্দ্রীয় অংশ শিবলিঙ্গের মতো এবং এর পরাগবাহী অংশ সাপের ফণার আকৃতির হওয়ায় এর নাম হয়েছে “নাগলিঙ্গম”। সুগন্ধে ভরপুর এই ফুল সাধারণত মার্চ থেকে জুলাই মাসে বেশি ফোটে। ফুল ফোটার মৌসুমে প্রকৃতিপ্রেমী, গবেষক ও দর্শনার্থীদের কাছে এটি বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

পরিবেশবিদদের মতে, এ ধরনের ঐতিহাসিক বৃক্ষ সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি বিরল উদ্ভিদকে রক্ষা করা নয়; একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করা। তাই গৌরীপুরের কালীপুর ছোট তরফ জমিদারবাড়ির এই প্রাচীন নাগলিঙ্গম গাছকে একটি ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষ হিসেবে সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ ও গবেষণার আওতায় আনা সময়ের দাবি।

Facebook Comments Box
ব্যাকগ্রাউন্ড
বর্ডার
শিরোনাম
ফন্ট: 55px

২৩ জুলাই, ২০২৬
গৌরীপুরের কালীপুর ছোট তরফ জমিদারবাড়ির শতবর্ষী নাগলিঙ্গম গাছ: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী
বিস্তারিত কমেন্টে

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

এই মাত্র পাওয়া

মো: আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার চেয়ারম্যান:
মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম,বিএ (অনার্স)এম এ বাংলা প্রকাশক ও সম্পাদক:
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

স্টেশন বাজার, কাপাসিয়া রোড,পূর্বধলা নেত্রকোনা।

হেল্প লাইনঃ 01711176181

E-mail: amdadul398@gmail.com

120